সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৮ পূর্বাহ্ন

সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট
ছবি সংগৃহীত।

জরুরি নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার নিরাপত্তা ত্রুটি থেকে সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘জরুরি নিরাপত্তা সমস্যার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত ও সমাধানে কাজ চলছে। ঝুঁকি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পর ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী সতর্কতা তৈরি হয়েছে। এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য হামলাকারীরা দূর থেকে সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা কার্যকর করার সুযোগ পেতে পারে। এতে সার্ভারের ফাইল, ডেটাবেজ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি পিএইচপিভিত্তিক আরও কিছু ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে কোনো সাইবার হামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত সার্ভারভিত্তিক প্রোগ্রামিং ভাষা। বিশ্বের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন সেবা পরিচালনায় এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহার করা হলেই সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে না। ব্যবহৃত সংস্করণ, নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং সার্ভারের সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সার্ভারে ব্যবহৃত পিএইচপির সংস্করণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ করা জরুরি। তাৎক্ষণিকভাবে ত্রুটি সংশোধন সম্ভব না হলে ফায়ারওয়াল ব্যবহার, অননুমোদিত সংযোগ সীমিত করা এবং প্রয়োজনে সার্ভার সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য ও অনলাইন সেবা ব্যবহারে সাময়িক অসুবিধা হতে পারে। তবে ওয়েবসাইটটি কখন পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানা যায়নি।




উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ শোধের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ, রিজার্ভে দ্বিগুণ চাপ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ শোধের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ, রিজার্ভে দ্বিগুণ চাপ
ছবি সংগৃহীত।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.২ শতাংশে। বিপরীতে আগামী পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে।

ফলে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং রিজার্ভের পর্যাপ্ততা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এ হার বাস্তবায়িত হলে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরের পর দেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হবে। একই প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ১০. ৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৮ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়ে বেশি।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১.৫৮ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভের এই অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি দিলেও আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করতে পারে।

পাঁচ বছরে ঋণ পরিশোধ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে মূল ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পরিমাণ বেড়ে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এরপর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।

অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে নেওয়া বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় এই চাপ বাড়ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল এবং বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ বড় প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের কিছু ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া বা শেষ হওয়ার পর্যায়ে থাকায় মূল ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ছে বলে ইআরডির তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋণ পরিশোধের এই অঙ্ক শুধু সরকারি বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে না; বিদেশি ঋণের অর্থ ডলারে পরিশোধ করতে হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তবে ঋণের কিস্তি কোন উৎস থেকে পরিশোধ হচ্ছে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের দায় কতটা এবং একই সময়ে নতুন ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা কত আসছে। এসব হিসাব বিবেচনায় না নিয়ে শুধু মোট ঋণ পরিশোধের অঙ্ক দিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপের পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।

মূল্যস্ফীতি বাড়লে আমদানি ব্যয়েও চাপ

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। যার মানে হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতেও বেশি ডলার প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। আবার টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিকারকদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে শুধু আমদানি ব্যয়ই বাড়ে না; পরিবহন ও উৎপাদন খরচের মাধ্যমে তা অন্যান্য পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে রিজার্ভের ওপর প্রকৃত চাপ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মূল্য পরিবর্তনের পাশাপাশি আমদানির পরিমাণ, সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি, মূল্য পরিশোধের সময়সূচি এবং বিনিময় হারও বিবেচনা করতে হবে।

চাল, পেঁয়াজ, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের দেশীয় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। বাজারদর নিয়ন্ত্রণে শুল্ক কমানো বা আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে এবং ডলারের বিনিময় হার প্রতিকূলে থাকলে আমদানিকারকের ব্যয় পুরোপুরি কমে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ব্যবস্থাপনা, দুটি বিষয়ই নীতিনির্ধারকদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রবৃদ্ধি কমলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ঝুঁকি

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সংস্থাটি গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের গতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমে গেলে রপ্তানি আয় বা বিদেশি বিনিয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। তবে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক চাহিদায় দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদা দুর্বল হলে অথবা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমলে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রবাসী আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনে স্বস্তি তৈরি হয়। তবে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখতে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো সহজ করা, বিনিময় হারে বাস্তবসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের প্রণোদনা কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসার পরিবেশ, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের আস্থা এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হতে পারে। ফলে রিজার্ভের স্থিতিশীলতার জন্য শুধু আমদানি কমানোর ওপর নির্ভর না করে রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বৈদেশিক ঋণে আতঙ্ক

আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের প্রাক্কলন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তবে এই অঙ্ককে এককভাবে ঋণসংকট বা রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইআরডির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের দায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উঠতে পারে।

ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ঋণের শর্ত, সুদের হার, মেয়াদ, নতুন ঋণপ্রবাহ এবং সরকারি রাজস্বের ওপর। দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের ঋণ এবং স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ঝুঁকি এক নয়। তাই নতুন ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল, ভবিষ্যৎ বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচি বিবেচনা করা জরুরি।

একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ দিয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবহন সুবিধা ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রকল্পের সুফল ও ঋণ পরিশোধের দায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে ভবিষ্যৎ বাজেট ও বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে বলছে আইএমএফ।

রিজার্ভের ওপর চাপ কতটা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৭ অক্টোবরের হিসাবে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। তবে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ হিসাব পদ্ধতির পার্থক্যে দুই অঙ্কের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান রয়েছে।

প্রবাসী আয় ও রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসা রিজার্ভের জন্য যেমন ইতিবাচক, তেমনি আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য ডলার বেরিয়ে যায়। ফলে রিজার্ভের স্থিতি নির্ভর করে বৈদেশিক মুদ্রা আসা ও বেরিয়ে যাওয়ার সামগ্রিক ভারসাম্যের ওপর। রেমিট্যান্স বাড়লেই যে রিজার্ভের ওপর সব ধরনের চাপ দূর হবে, তা নয়, একইভাবে ঋণ পরিশোধের অঙ্ক বাড়লেই রিজার্ভ দ্রুত কমে যাবে। এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যে কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ সামাল দিতে প্রথমেই বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে টেকসই ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন। এজন্য রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় বৈধ পথে আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে আইএমএফ প্রতিবেদনে।

দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। কোন বছরে কত ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে, কোন প্রকল্প থেকে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুফল আসবে এবং নতুন ঋণ নেওয়ার ফলে ভবিষ্যৎ দায় কতটা বাড়বে। এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু তাৎক্ষণিক অর্থের প্রয়োজন নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

তৃতীয়ত, আমদানি ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্যের চাহিদা কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, কৃষি উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সচল রাখতে হবে। নির্বিচারে আমদানি সংকোচন করলে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে। তাই অগ্রাধিকার নির্ধারণে সতর্ক নীতি প্রয়োজন।

চতুর্থত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় জরুরি। বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা উন্নত করলে অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা জোরদারের ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অঙ্ক ধরে রাখা নয়; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং প্রবৃদ্ধির দুর্বলতার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য তৈরি করা। রিজার্ভের পর্যাপ্ততা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি ও কার্যকর সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আইএমএফ বার্ষিক প্রতিবেদনে।




জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বড় পরিকল্পনা সরকারের

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বড় পরিকল্পনা সরকারের
ছবি সংগৃহীত।

গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন, তিন থেকে চারটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পুঁজিবাজারে বিশেষ তহবিল গঠন এবং ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কারের পরিকল্পনা করছে সরকার।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফিকির আয়োজিত ‘টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: বাংলাদেশে বিনিয়োগের চালিকাশক্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব তথ্য জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।


তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাত এখন অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা এবং বিদেশে ডলার পাচারের মতো গভীর সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার নিরলস কাজ করছে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস অনুসন্ধান এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসন, ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারে সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড় ও প্রণোদনা
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার পূর্ণাঙ্গ কর ছাড় ও প্রণোদনা সুবিধা দিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাসাবাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনে মানুষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এসব স্থাপনায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ স্বাভাবিক দরের চেয়ে বেশি দামে কিনে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।

দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধানেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এজন্য সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা
গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, চুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধান কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।

গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তিন থেকে চারটি নতুন ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব টার্মিনাল স্থাপনে কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যুক্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি।

এছাড়া মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছাকাছি গভীর পানির একটি নতুন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে ২০ মিটার গভীরতায় বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস খালাসের সুবিধাসম্পন্ন আধুনিক টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি জ্বালানি কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


রাজস্ব প্রশাসন ও ব্যাংক খাতে সংস্কার
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে রাজস্ব প্রশাসন পুনর্গঠনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো নীতি প্রণয়নে স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করা।

তিনি বলেন, ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজার পুনর্গঠনের পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমাতে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ শিথিল করা হচ্ছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা আরও সহজে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার।

হংকংয়ের পুঁজিবাজারে বিশেষ তহবিল
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হংকংয়ের পুঁজিবাজারে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিল খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।




শনিবার খোলা থাকবে সব ব্যাংক ও শেয়ারবাজার

শনিবার খোলা থাকবে সব ব্যাংক ও শেয়ারবাজার
ছবি সংগৃহীত।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও শনিবার (১৭ অক্টোবর) সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি, ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে লেনদেন চালু থাকবে। দুর্গাপূজার ছুটি সমন্বয়ের কারণে কাল শনিবার ব্যাংক ও শেয়ারবাজার খোলা থাকবে।    

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিন বন্ধ থাকবে। তার পরের দুই দিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে সব মিলিয়ে টানা পাঁচ দিন (২০–২৪ অক্টোবর) সব ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত রোববার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে এই নির্দেশনা দিয়েছে। এতে ১৭ অক্টোবর (শনিবার) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সাধারণ কর্মদিবসের মতো ব্যাংক খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এর আগে, ৭ অক্টোবর পূজার ছুটির প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর (মঙ্গলবার) নবমী উপলক্ষ্যে নির্বাহী আদেশে আগেই ছুটি ঘোষণা ছিল। পরদিন ২১ অক্টোবর (বুধবার) বিজয়া দশমী উপলক্ষ্যে সাধারণ ছুটি। ২২ অক্টোবর (বৃহস্পতিবারও) নির্বাহী আদেশে ছুটি দিয়ে দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর ছুটি ঘোষণা করা হয়। আর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

তবে, ২২ অক্টোবরের ছুটির পরিবর্তে আগামী শনিবার (১৭ অক্টোবর) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অফিস খোলা থাকবে।